মহমেডানের জয়রথ থামিয়ে দিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল

একটা ব্যাপার উল্লেখ করতেই হচ্ছে, তা হল, ইস্টবেঙ্গল ক্লাব প্রতিষ্ঠার নেপথ্য কাহিনী। সেই কাহিনী এই সিরিজের আগের একটি লেখায় আমরা তুলে ধরেছি।


একটা ব্যাপার মানতেই হবে, তা হল, ক্লাবের সঙ্গে যদি রায়বাহাদুর তড়িৎ ভূষণ রায় যুক্ত না হতেন তাহলে হয়তো সুরেশ চন্দ্র চৌধুরীর স্বপ্ন সফল হত না। তাঁর একনিষ্ঠতা, পরিশ্রম, অধ্যবসায়, অর্থব্যয় সবই হয়তো বিফলে যেত।


প্রথমদিকে সুরেশ চন্দ্র চৌধুরী মহাশয়ের সঙ্গে রায়বাহাদুর তরিৎ ভূষণ রায় এবং পরবর্তীতে সন্তোষের মহারাজা মন্মথ নাথ রায়চৌধুরী ও নলিনীরঞ্জন সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে ক্লাবকে এগিয়ে নিয়ে যান। অনেক রকম বাধা-বিপত্তি তাঁরা অতিক্রম করেছেন। পরবর্তীতে আরো দু'জনের নাম না করলে সত্যের বিকৃতি হবে – তাঁরা হলেন ঢাকা জেলার ভাগ্যকুলের বিখ্যাত কুন্ডু বংশের বনোয়ারীলাল রায় এবং প্রবাদপ্রতিম সচিব জ্যোতিষ চন্দ্র গুহ।


ঘটনা হল, ১৯২৪ সালে ক্লাব যেবার প্রথম ডিভিশনে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে সে বছর থেকে একটানা ১৯৪১ সাল পর্যন্ত বনোয়ারীলাল রায় ক্লাবের সচিব ছিলেন। সেই সময়ে প্রথম শ্রেণীর ট্রফি ক্লাব জিততে পারেনি ঠিকই, তবে একাধিকবার কলকাতা লিগে রানার্স হয়েছে। যেমন ১৯৩২ সালে মাত্র এক পয়েন্টের ব্যবধানে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ডারহাম এল আই। ১৮ ম্যাচে ডারহামের পয়েন্ট ছিল ২৭। ইস্টবেঙ্গলের ২৬। ১৯৩৩ সালে ২০ ম্যাচে ডারহাম ২৬, ইস্টবেঙ্গল ২৫। প্রসঙ্গত ডারহাম এল আই তখন যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৩ পর্যন্ত একটানা তিনবার তারা কলকাতা লিগ জিতেছিল।


১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত একনাগাড়ে পাঁচ বছর কলকাতা লিগ জিতে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল মহমেডান স্পোটিং ক্লাব। সেখানেও দেখা যাচ্ছে ১৯৩৫ ও ১৯৩৭ সালে রানার্স হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। তারমধ্যে ১৯৩৫ সালে ব্যবধান ছিল মাত্র ১ পয়েন্টের। ২২ ম্যাচে মহমেডান সংগ্রহ করেছিল ৩০ পয়েন্ট, ইস্টবেঙ্গল ২৯।

১৯৪২ সালের কলকাতা লিগে বিজয়ী ইস্টবেঙ্গল দলের সদস্যরা

স্বভাবতই এ কথা মানতেই হবে যে, বনোয়ারীলাল রায় সচিব থাকাকালীন সময়ে ইস্টবেঙ্গল কলকাতা লিগ জিততে না পারলেও তিনবার তারা মাত্র এক পয়েন্টের ব্যবধানে খেতাব থেকে ছিটকে গিয়েছিল। তিঁনি সচিব থাকাকালীন সময়েই কলকাতা লিগে মোহনবাগানের বিপক্ষে প্রথম লড়াইয়ে ইস্টবেঙ্গল জিতেছিল ১৯২৫ সালে।


তবে এটাও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, বনোয়ারিলাল সচিব থাকাকালীন সময়ে ১৯২৮ সালে লিগে সবার নিচে শেষ করে দ্বিতীয় ডিভিশনে নেমে যায় ইস্টবেঙ্গল। ১৯৩১ সালে আবার দাপটের সঙ্গে খেলে দ্বিতীয় ডিভিশনে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আবার উঠে আসে প্রথম ডিভিশনে।


কলকাতা ফুটবলে দুই বড় দল প্রথম মুখোমুখি হয় ১৯২৫ সালে। ফাইনালে মোহনবাগানকে ১-০ গোলে পরাজিত করে ইস্টবেঙ্গল। গোল করেছিলেন নেপাল চক্রবর্তী। খেলেছিলেন– মনি তালুকদার, প্রফুল্ল চট্টোপাধ্যায়, বিজয়হরি সেন, এস. নাগ, ননী গোঁসাই, বি. গুহ, মনা মল্লিক, সুধীর মিত্র, মোনা দত্ত, হেমাঙ্গ বসু এবং নেপাল চক্রবর্তী। প্রসঙ্গত, ইস্টবেঙ্গল যখন ছিল দ্বিতীয় ডিভিশনে, তখন মোহনবাগান খেলত প্রথম ডিভিশনে। শক্তিশালী মোহনবাগান দলে ছিলেন গোষ্ঠ পাল, বলাইদাস চট্টোপাধ্যায়ের মতো খ্যাতনামা ফুটবলাররা।


আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতেই হবে। তা হল, সেই সময়ে বনোয়ারীলাল এক লক্ষ টাকা খরচ করেছিলেন ক্লাব পরিচালনার জন্য।


এ কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ১৯১১ সালে ব্রিটিশদের হারিয়ে প্রথম কোনো ভারতীয় ক্লাব আইএফএ শিল্ড জিতেছিল। সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মোহনবাগান। কিন্তু এটাও ঘটনা যে, তার পরেও দীর্ঘ ২২ বছর বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলে জয়যাত্রা অব্যাহত ছিল ব্রিটিশদের। সেই হিসেবে ব্রিটিশদের কলকাতা ফুটবল লিগ থেকে চিরতরে 'গুডবাই' জানিয়েছিল মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাব। ১৯৩৪ সাল থেকে কলকাতা লিগে একনাগাড়ে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মহমেডান।


১৯৩৯ সালে ইস্টবেঙ্গল, মহমেডান এবং তৎকালীন শক্তিশালী দল কালীঘাট আইএফএ-র লিগ পরিচালনা পদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে অংশগ্রহণ করেনি। সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মোহনবাগান। ১৯৪০ সালে আবার লিগ খেলায় অংশগ্রহণ করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মহমেডান। ১৯৪১ সালেও কলকাতা লিগ উঠেছিল মহমেডান তাঁবুতে।


এক কথায় সেই সময় মহমেডান ক্লাবের অশ্বমেধের জয়রথ ছুটছিল দুর্বার গতিতে। তাদের জয়রথ কলকাতা লিগে প্রথম ধাক্কা খায় ১৯৪২ সালে। সেবার মহমেডানকে পিছনে ফেলে লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় ইস্টবেঙ্গল।