বঞ্চনার জবাবে জন্ম ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের

Updated: Dec 5, 2020

বাংলা তথা ভারতবর্ষে ফুটবল খেলার প্রচলন করেছিলেন ব্রিটিশরা । এই খেলা দেখতে আগ্রহী ছিলেন বাঙালিরা । কিন্তু খেলায় অংশগ্রহনের সুযোগ ছিল না বাঙালিদের । কারণ, “নেটিভদের” ঘৃণা করত সাদা চামড়ার ইংরেজরা । তাই খেলা দেখতে ভালো লাগলেও অংশগ্রহন করতে না পারার জন্য ক্ষোভ ছিল ভারতীয়দের মধ্যে । তবে একটা দিন এল যখন থেকে ভারতীয়রা ফুটবল খেলতে শুরু করলেন । ভারতীয়দের মধ্যে ফুটবলে প্রথম শট মেরেছিলেন নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী। তিঁনি স্কুলের বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ফুটবল দল গড়েছিলেন হেয়ার স্কুলে। সেই থেকে যাত্রা শুরু। পরবর্তীতে ফুটবল খেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় মোহনবাগান, এরিয়ান, কুমারটুলি, শোভাবাজার, ন্যাশনাল ক্লাবগুলো। প্রসঙ্গত, এই ক্লাবগুলোর মতো হেয়ার স্কুলও ছিল উত্তর কলকাতার। এই দলে নতুন সংযোজন হল 'ইস্টবেঙ্গল'। নামে পূর্ববঙ্গীয় হলেও ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের জন্ম উত্তর কলকাতার কুমারটুলিতে।


কিন্তু কেন মোহনবাগান এবং অন্যান্য দলগুলোর প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর বাদে ইস্টবেঙ্গলীরা নতুন একটা ক্লাবের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন ? এর পিছনে একটা মান-অভিমান-বঞ্চনার ঘটনা রয়েছে।

ঘটনা হল, 'ইস্টবেঙ্গল' নামের কোনো ক্লাব আগে না থাকলেও বিভিন্ন ক্লাবে ওপার (পূর্ব) বাংলার ফুটবলাররাই দাপটের সঙ্গে বিচরণ করতেন। দিকপাল ফুটবলার 'চাইনিজ ওয়াল' বলে খ্যাত পদ্মশ্রী গোষ্ঠ পাল নিজে সারাটা জীবন মোহনবাগানে খেললেও তাঁরও জন্ম পূর্ববঙ্গের ঢাকা জেলায়। তাঁরও আগে ১৯১১ সালে আইএফএ শিল্ড জয়ী ঐতিহাসিক মোহনবাগান দলেও খেলেছিলেন বেশ কয়েকজন ওপার বাংলার ফুটবলার। তবুও পূর্ব বাংলার ফুটবলাররা এপার বাংলায় সংঘবদ্ধ একটা দল গড়ার চেষ্টা করেননি।


নতুন একটা ক্লাব গঠনের প্রয়োজনীয়তা প্রথম এল ১৯২০ সালে। এই ক্লাব প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন পূর্ব বাংলার ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমার নাগপুরের জমিদার সুরেশ চন্দ্র চৌধুরী। সেই সময় তিঁনি ছিলেন উত্তর কলকাতার জোড়াবাগান ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট। কিন্তু একটা ব্যাপারে তাঁর মান-সম্মানে আঘাত লেগেছিল বলে তিঁনি জোড়াবাগান ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের ইতিহাস নিয়ে যেসব গবেষকরা বিস্তারে চর্চা করেছেন, যেমন ষাটের দশকে পন্ডিতমশাই এবং পরবর্তীকালে পরেশ নন্দী ও গৌতম রায়, এবং ইন্টারনেট সূত্রে পাওয়া তথ্য (যাদের মধ্যে goal.com [১], frontline.thehindu.com [২], hindustantimes.com [৩], aajkaal.in [৪], bengali.indianexpress.com [৫], telegraphindia.com [৬] এবং আইএসএল-এর সরকারি ওয়েবসাইট [৭] অন্যতম) অনুযায়ী, জোড়াবাগান ক্লাবের নিয়মিত ফুটবলার ও ক্রিকেটার ছিলেন ঢাকা বিক্রমপুর জেলার নিবাসী শৈলেশ চন্দ্র বসু। কিন্তু ১৯২০ সালের ২৮শে জুলাই মোহনবাগানের বিরুদ্ধে কোচবিহার কাপের ফুটবল ম্যাচে কোনো কারণ না দেখিয়ে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়। নিয়মিত ভালো খেলা সত্বেও দলে জায়গা না হওয়ায় আশাহত শৈলেশ বাবু তাঁর ক্ষোভের কথা জানিয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট সুরেশ চন্দ্র চৌধুরীকে। দলে শৈলেশ সুযোগ না পাওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাননি সুরেশবাবু। এ ব্যাপারে সিলেকশন কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেও কোনো সদুত্তর পাননি। তবে বুঝতে পেরেছিলেন একটা নোংরামি ও সঙ্কীর্ণতার কারণে শৈলেশকে দলে নেওয়া হয়নি। এতটাই মর্মাহত হয়েছিলেন তিঁনি যে জোড়াবাগান ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতেও দ্বিধাবোধ করেননি।

প্রয়াত শৈলেশ বসুর একমাত্র পুত্র দীপক বসু ঠাকুর অবশ্য শৈলেশ বাবু ও নসা সেনের সেদিন না খেলা নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী,'আমার বাবাকে কোনো খেলায় বাদ দেওয়া হয়নি। বাবা নিজেও বারেবারে এই কথাটি বলে গেছেন। সেদিন জোড়াবাগান হেরে যাওয়াতে, খারাপ খেলার অজুহাত দেখিয়ে বাবা আর নসা সেনকে অন্যায় ভাবে তিরস্কার করেছিল জোড়াবাগান কর্তৃপক্ষ। শুধু তাঁরাই নন, সেদিন সুরেশ চৌধুরীকেও কটু কথা বলতে তারা দ্বিধা করেননি।'


যাই হোক, ক্লাব থেকে যথাযোগ্য সম্মান না পাওয়ায় নিরুৎসাহিত হলেও ঘরে বসে থাকার পাত্র সুরেশ বাবু ছিলেন না। শৈলেশ বসুকে নিয়ে একদিন তিঁনি ঠিক করলেন বিভিন্ন ক্লাবের পূর্ববঙ্গীয় ফুটবলারদের নিয়ে আলাদা একটা দল গড়বেন। সেই দল ভাদ্র-আশ্বিন মাসে কুমারটুলি পার্কে আয়োজিত হারকিউলিস ট্রফিতে প্রথম বছরেই চ্যাম্পিয়ন হল। যেহেতু প্রতিযোগিতাটি আইএফএ-তে রেজিস্টার্ড ছিল না, সেই সূত্রে অন্যান্য ক্লাবের বাছাই করা ফুটবলারদের নিয়ে দল গড়তে অসুবিধা হয়নি।


হারকিউলিস ট্রফির সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে সুরেশ চন্দ্র চৌধুরী ক্লাবকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য উদ্যোগী হলেন। এই ব্যাপারে পাশে পেলেন ঢাকা জেলার ভাগ্যকুলের বিখ্যাত কুন্ডু পরিবারের সন্তান, রায় বাহাদুর তড়িৎভূষণ রায়-কে। কুমারটুলি পার্কের উল্টোদিকে রায় বাহাদুরের নিজস্ব ভবন। সেই বাড়িতে ১৯২০ সালের নভেম্বর মাসের একদিন মিলিত হলেন পূর্ববঙ্গীয় গন্যমান্য ব্যক্তিরা। সেই সভায় সভাপতিত্ব করেন বিদ্যাসাগর কলেজের অধ্যক্ষ সারদা রঞ্জন রায়। পাশাপাশি তিঁনি ছিলেন একজন খ্যাতনামা ক্রিকেটার। তাঁর বিশাল চেহারা এবং গাল ভর্তি দাড়ি ছিল কিংবদন্তি ক্রিকেটার ডব্লিউ.জি. গ্রেসের মতো। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন সারদা রঞ্জন, যুগ্ম সম্পাদক পদে সুরেশ চন্দ্র চৌধুরী ও তড়িৎভূষণ রায়। এক্ষেত্রে দীপক বাবু যোগ করেন, 'জোড়াবাগান-মোহনবাগান ম্যাচের পরের দিনই বাবা, নসা সেন মিলে সুরেশ চৌধুরীর বাড়িতে যান এবং সেখানে সুরেশ বাবু ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ। এই কজন মিলেই সেদিন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের নামকরণ আর প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে চূড়ান্ত আলোচনা করেন। ক্লাব প্রতিষ্ঠা হওয়ার কয়েকদিন পর ক্লাবের রেজিস্ট্রেশন করা হয়। সেই দিন রেজিস্ট্রেশন করার পর ধর্মতলার একটি স্টুডিও-তে বাবা, নসা সেন আর সুরেশ চৌধুরী মিলে ছবিও তোলেন। এই সমস্ত ঘটনা হওয়ার পরে বাবা একদিন নিজে রায় বাহাদুর তড়িৎভূষণ রায়ের সাথে সুরেশ চৌধুরীর বৈঠক করিয়ে দেন। আর তারপরেই সেই ঐতিহাসিক মিটিং, যেখানে ক্লাবের প্রথম কর্মসমিতির বৈঠক হয় আর কমিটি তৈরী হয়।'


বলতে দ্বিধা নেই, রায় বাহাদুরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা না পেলে ক্লাবের অস্তিত্ব বজায় রাখা যেত কিনা সন্দেহ। পাশাপাশি আরও দুজনের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সহযোগিতার কথা বলতেই হয়—তারা হলেন জিতু মুখার্জি ও বনোয়ারীলাল রায় । পরবর্তীকালে আরও দুটি নাম উল্লেখ করতেই হবে, তারা হলেন যথাক্রমে জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষ এবং জ্যোতিষচন্দ্র গুহ।


তথ্যসূত্র:-


. https://www.goal.com/en-india/news/136/india/2008/09/17/869244/club-day-east-bengal-the-history

. https://frontline.thehindu.com/the-nation/100-not-out/article32268419.ece

. https://www.hindustantimes.com/football/east-bengal-s-100-years-of-spunk/story-zR5ul16ecve8XAB9KnqkBM.html

. https://www.aajkaal.in/news/editorial/east-bengal-s-history-fm1e

. https://www.google.com/amp/s/bengali.indianexpress.com/sports/history-behind-east-bengal-club126069/lite/

. https://www.telegraphindia.com/sports/football/east-bengal-legends-who-shaped-an-icon/cid/1695624

. https://www.indiansuperleague.com/features/how-kolkata-derby-came-into-being-and-what-it-means-to-the-inhabitants-of-the-city